গাজায় ট্রাম্প প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে অংশ নিতে আগ্রহী বাংলাদেশ

গাজায় ট্রাম্প প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে অংশ নিতে আগ্রহী বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের এই অবস্থানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, ওয়াশিংটন সফররত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট আলিসন হুকার এবং সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে গাজা ইস্যুতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।

বৈঠকে গাজা পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক আলোচনায় আসে। এর মধ্যে ছিল বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভিসা বন্ড বাধ্যতামূলক করা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে, যা পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের স্বল্পমেয়াদি ভিসা প্রাপ্তিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে গাজা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত বাহিনীতে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই অবস্থানের পেছনে কী ধরনের কৌশলগত বিবেচনা রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ইঙ্গিত দিতেই বাংলাদেশ এই আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সাধারণত জাতিসংঘের অধীনে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়। গাজায় প্রস্তাবিত বাহিনী যদি জাতিসংঘের অনুমোদন বা তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়, তাহলে সেখানে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা অস্বাভাবিক হবে না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাব এনাম খানও মনে করেন, প্রস্তাবিত বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নেতিবাচক দিক নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়াশিংটন সফরকালে আলিসন হুকার ও পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক, আগামী সংসদ নির্বাচন, রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। খলিলুর রহমান বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি এবং এর ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।

এ সময় তিনি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য বি–১ ভিসাকে ভিসা বন্ডের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানান। প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, আলিসন হুকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন এবং পর্যটন ভিসায় মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে কমলে ভিসা বন্ড নীতিমালা পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তিনি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতার প্রশংসাও করেন।

এই বিবৃতিতেই গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে আগ্রহের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তবে বাহিনীটি কীভাবে গঠিত হবে, যুক্তরাষ্ট্র না কি জাতিসংঘের আওতায় এর কার্যক্রম চলবে এবং এর নির্দিষ্ট দায়িত্ব কী হবে—এসব বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

গত নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গাজা উপত্যকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাব গৃহীত হয়। ওই প্রস্তাবে গাজায় যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থনের পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, বাহিনীটি গাজায় নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে, যার মধ্যে অস্ত্র জমা নেওয়া ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ইতোমধ্যে পাকিস্তান এই প্রস্তাবিত বাহিনীতে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, আইএসএফ-এর ম্যান্ডেট ও কার্যপরিধি নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

এর আগে গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন, অনেক দেশই আইএসএফ-এ অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখিয়েছে। সে সময় তিনি বলেন, বাহিনীতে এমন দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন, যাদের উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাহিনীটির মিশনের পরিধি এখনও অস্পষ্ট থাকায় কিছু দেশ উদ্বিগ্ন যে, সমঝোতা ছাড়া মোতায়েন হলে তাদের বাহিনী সরাসরি হামাস যোদ্ধাদের মুখোমুখি হতে পারে।

হুমায়ুন কবিরের মতে, বাহিনীটি যদি জাতিসংঘের আওতায় গঠিত হয়, তাহলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে বড় কোনো কূটনৈতিক বাধা নেই। তিনি বলেন, সাধারণত বাংলাদেশ জাতিসংঘ অনুমোদিত শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেই অংশ নেয়, এবং এই বাহিনীও সে কাঠামোর মধ্যে আসতে পারে—এমন ধারণা থেকেই আগাম আগ্রহ জানানো হয়েছে।

এদিকে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত এক বছরে ২৫০ জনের বেশি বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ভিসা বন্ড নীতির আওতায় বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত জমা দিতে হতে পারে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার অন্তত ব্যবসায়ীদের জন্য এই নীতি শিথিল করার চেষ্টা করছে।

একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ রয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৮ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, বিপরীতে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ছিল ২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার।

এই ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, তুলা ও এলএনজিসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি বাড়িয়েছে। ঢাকায় কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের চেষ্টা চলছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের ধারণা, গাজা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবে আগ্রহ প্রকাশ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার কৌশলগত পদক্ষেপেরই অংশ।

Insights News Desk

International

শেয়ার করুন

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *