
বসুন্ধরায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়া হত্যা : পরিকল্পিত মব হামলার অভিযোগ
ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়া হত্যা পরিকল্পিত ছিল বলে দাবি করেছে তাঁর পরিবার। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি কোনো হঠাৎ সংঘর্ষ নয়; বরং নাঈমকে দীর্ঘদিন অনুসরণ করে পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ তৈরি করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও পুলিশ এখনো কাউকে শনাক্ত বা আটক করতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
বুধবার রাতের ঘটনায় পুলিশ জানায়, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি সড়কে নাঈম কিবরিয়াকে বহনকারী একটি প্রাইভেট কারের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগে। এরপর মোটরসাইকেলের চালকসহ কয়েকজন যুবক সেখানে জড়ো হয়ে ‘মব’ তৈরি করে নাঈমকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তবে নাঈম কিবরিয়ার খালাতো ভাই রাকিবুল ইসলাম এ ঘটনার পেছনে আরও গভীর পরিকল্পনা রয়েছে বলে মনে করছেন। তিনি জানান, নাঈমের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলা রয়েছে, যা পাবনা সদর থানায় দায়ের করা হয়। ওই মামলার পর থেকেই পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল।
রাকিবুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলা হওয়ার পর নাঈম ও তাঁর পরিবার পাবনার সদর থানার চক জয়েনপুর এলাকার বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তবুও সেখানে একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ তিন দিন আগেও নাঈমদের গ্রামের বাড়িতে ‘মব’ তৈরি করে হামলা চালানো হয়। বাড়িতে কেউ না থাকায় হামলাকারীরা ফিরে যায়।
নাঈম কিবরিয়া পাবনা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী ছিলেন। তাঁর বাবা গোলাম কিবরিয়া একজন খামারি এবং মা আইরিন কিবরিয়া পাবনা জেলা পরিষদের সাবেক প্যানেল মেয়র। মামলার কারণে নাঈম পাবনায় নিয়মিত আইন পেশা পরিচালনা করতে পারছিলেন না।
রাকিবুল ইসলাম জানান, হত্যা মামলায় জামিনের জন্য নাঈম প্রায় ১০ দিন আগে ঢাকায় আসেন এবং পূর্বাচলে তাঁর বাসায় ওঠেন। ওই সময় থেকেই তাঁকে অনুসরণ করা হচ্ছিল বলে পরিবারের সন্দেহ।
বুধবার রাতে নাঈম তাঁর এক বন্ধুর প্রাইভেট কার নিয়ে বাসা থেকে বের হন। রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের ১০ নম্বর সড়কে তাঁর গাড়ি আটকানো হয়। সেখানে জড়ো হওয়া একটি দল নাঈমকে গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করে এবং রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায়। এ সময় গাড়িটিও ভাঙচুর করা হয়।
নাঈম বাড়ি ফিরতে দেরি করায় রাকিবুল ইসলাম তাঁর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ফোনটি ধরেন বসুন্ধরা এলাকার একজন নিরাপত্তাকর্মী, যিনি জানান নাঈমকে মারধর করে ফেলে রাখা হয়েছে। পরে রাকিবুল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক নাঈমকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাকিবুল আরও বলেন, যে হত্যা মামলায় নাঈম আসামি ছিলেন, সেখানে তাঁর পরিচিত পাবনার তিনজনও আসামি। ছয় থেকে সাত মাস আগে ঢাকার মিরপুর এলাকায় তাঁদের ওপরও একইভাবে ‘মব’ তৈরি করে হামলা চালানো হয়। সে সময় সেনাসদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করে পুলিশে হস্তান্তর করেন। পরে তাঁরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান এবং সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পান।
নাঈম কিবরিয়ার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমাউল হক বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যার পেছনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হবে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, শুক্রবার পাবনার সদর থানার চক জয়েনপুর এলাকায় জানাজা শেষে নাঈম কিবরিয়াকে বালিয়াহাট কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তাঁর বাবা-মা গভীর শোকে ভেঙে পড়েছেন।
Insights News Desk
National


Leave a Reply