
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যে গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে, সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে কোনোভাবেই জয়ী হতে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের এই প্রক্রিয়াকে তিনি অপ্রয়োজনীয় ও বিভ্রান্তিকর মনে করেন। তাঁর ভাষায়, জনগণ বুঝে গেছে এই গণভোটের উদ্দেশ্য কী, সে কারণেই ‘হ্যাঁ’ পক্ষ আগেই পরাজিত হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার কনফারেন্স হলে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণে আদিবাসী জনগণের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম অভিযোগ করেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ফল নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক নির্দেশনা ও সরকারি অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনগণকে নিজেদের অধিকার আদায়ে আরও সংগঠিত ও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে এসেছে। তাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল থাকায় এই বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণ–অভ্যুত্থানের পর নতুন বন্দোবস্তের কথা বলা হলেও বাস্তবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন এই বামপন্থী নেতা। তাঁর মতে, সংস্কারের নামে দেশকে পিছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি।
তিনি আরও বলেন, গরিব, মেহনতি ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আবারও গণ–অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক সম্পাদক সতেজ চাকমা। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনগণকে উপেক্ষা করে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দেয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্য তুলে ধরে সতেজ চাকমা জানান, ২০২৫ সালে দেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর ৯৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪১টি ছিল রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার–সংক্রান্ত।
তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে আদিবাসীদের জন্য কোনো আলাদা কমিশন গঠন হয়নি। ফলে তারা এখনো উপেক্ষিত।
বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর স্বীকৃতি, ভূমি অধিকারের নিশ্চয়তা, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল, সংসদে সংরক্ষিত আসন এবং নিজ নিজ মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন আইনজীবী সারা হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান, বাসদের সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন এবং ঢাকা–১২ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি টনি চিরান। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরা।