
চট্টগ্রাম নগরের পুরোনো অংশ নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৯ সংসদীয় আসনকে স্থানীয় রাজনীতিতে বলা হয় ‘ক্ষমতার দোরগোড়া’। কারণ, সাম্প্রতিক কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস বলছে—এই আসনে যে দলের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, তারাই রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে। ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই আসনের ফল জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৫ থেকে ২৩ এবং ৩১ থেকে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৯। বাগমনিরাম, চকবাজার, বাকলিয়া, দেওয়ানবাজার, জামালখান, এনায়েত বাজার, আলকরণ, আন্দরকিল্লা, ফিরিঙ্গীবাজার, পাথরঘাটা ও বক্সিরহাট—এই এলাকাগুলো চট্টগ্রামের ইতিহাস, বাণিজ্য ও নগরজীবনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এই আসনের গুরুত্ব শুধু ঐতিহ্যের কারণে নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রগুলো এখানেই অবস্থিত। ফলে ভোটারদের প্রত্যাশাও তুলনামূলকভাবে বেশি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র
চট্টগ্রামের একাধিক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম-৯ আসনের মধ্যে রয়েছে। চট্টগ্রাম কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং কলেজিয়েট স্কুল এই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
স্বাস্থ্যসেবায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালের পাশাপাশি রয়েছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগনির্ণয় কেন্দ্র। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এই আসনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, থিয়েটার ইনস্টিটিউট ও মুসলিম হল এখানেই অবস্থিত।
চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত সিআরবিও এই আসনের অন্তর্ভুক্ত। তবে এই সবুজ এলাকাকে ঘিরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সময়ে সময়ে বিতর্ক হয়েছে। ভোটারদের বড় অংশ চান, নির্বাচিত প্রতিনিধি যেন সিআরবি সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।
বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র
দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ চট্টগ্রাম-৯ আসনের ভেতরে। এর পাশাপাশি নিউমার্কেট, রেয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, হকার্স মার্কেট, ফিশারিঘাটের মাছের আড়ত ও ফলমন্ডির ফলের আড়তও এই এলাকায় অবস্থিত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে হলে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও অবৈধ হয়রানি বন্ধের দাবি দীর্ঘদিনের।
এই আসনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর উপস্থিতির কারণে। আদালত, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং সিটি করপোরেশনের প্রধান কার্যালয় এই আসনের মধ্যেই রয়েছে।
ভোটের ইতিহাসে ‘ক্ষমতার সমীকরণ’
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান এই আসনে জয়ী হন এবং ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান জয়ী হলে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০১ সালে আবার বিএনপি জয় পায় এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিজয়ী হন আফসারুল আমিন।
দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক থাকায় ওই সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরাই এই আসনে জয়ী হন বলে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করেন।
এবারের নির্বাচন ও প্রার্থী চিত্র
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। চট্টগ্রাম-৯ আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১০ জন প্রার্থী। মোট ভোটার ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৬৩ জন, এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৪৪৮ জন।
বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন আবু সুফিয়ান, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ। স্থানীয় ভোটারদের মতে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই তিন প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
নাগরিক সমস্যা ও প্রত্যাশা
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুপেয় পানির সংকট, জলাবদ্ধতা, ভাঙা সড়ক, ময়লা-আবর্জনা, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই—এই সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। ব্যবসায়ীরা বিশেষভাবে বাজারে চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে ধরেছেন।
ভোটারদের বড় অংশ বলছেন, তাঁরা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়—নিরাপদ নগর, নিয়মিত পানি সরবরাহ, জলাবদ্ধতামুক্ত সড়ক, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, চাঁদাবাজিমুক্ত বাজার এবং সিআরবির মতো সবুজ এলাকা সংরক্ষণের বাস্তব নিশ্চয়তা চান।


Leave a Reply